মতামত

আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি

rima7ফান্ডামেন্টাল অব স্পিচ ক্লাসে আমার ডেমোনেসট্রেট স্পিচের প্রেজেন্টেশন ছিল।

অর্থাৎ ক্লাসভর্তি শিক্ষার্থীদের সামনে এমন একটা কিছু করে দেখাতে হবে, যা থেকে তারা কিছু শিখতে পারবে। সাবলীলভাবে উপস্থাপন করা এবং তার সঙ্গে রিলেটেড অ্যাক্টিভিটি। কী করি!
মুহূর্তে মনটা দুলে উঠল, কত কী আছে আমাদের! ইয়েস! মেহেদী। আজকে আমি এই টপিকই প্রেজেন্ট করব।
বিষয়টা মাথায় এল, কারণ এই এক জিনিস যেদিনই হাতে দিয়ে কলেজে গিয়েছি, সে দিনই ট্রলি ভর্তি প্রশংসা আর মুগ্ধতা নিয়ে কলেজ থেকে ফিরেছি। অতঃপর সেদিনই শিক্ষক থেকে শুরু করে যেই সামনে পড়েছে, তাকেই মেহেদী পরিয়ে দেবার বায়নাও নিয়েছি!
ভালোই কাটছিল সময়। শিক্ষক এলিজাবেথ প্যারেলের বলা, ‘টুডে ইউ টট আস মোস্ট ক্রিয়েটিভ থিংস। জাহান, ইউ ডিড গুড জব! ’ প্রশংসার হাওয়া গায়ে লাগিয়ে পরবর্তী ক্লাসের অপেক্ষা আমার।
এরই মাঝে হয়ে গেল খুন! প্রকাশ্যে একজন বিজ্ঞান লেখককে কুপিয়ে হত্যা। সঙ্গে তার সহধর্মিণীকে ৷ সেই খুনের দৃশ্য বহন করার এক দুর্বিষহ বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রদান।
ভিন্ন চিন্তা থাকতেই পারে। বিশ্বাসের নিঃশ্বাস যার যার নিজস্ব। তাকে খুন করার এই কর্মটি করতে আদতে কোনো ধর্ম বলে দেয়নি। কলমের জবাব তলোয়ারে দিতে নেই। পারলে কলমই ধরুক।
আমার পরবর্তী ক্লাস শুরু। অস্থির লাগছে।
ডেভিড ফ্রিম্যানের কম্প ক্লাস আজ আর প্রসঙ্গ পেল না! আজই কেন প্রশ্ন করতে হবে তোমাদের শিকড় কোথায়? কে কে ফিরে যেতে চাও শিকড়ের কাছে? ভারতী মুখার্জির ‘টু ওয়েজ টু বিলং ইন আমেরিকা’র হাত ধরে সেসব আলোচনা অনায়াসে চলে আসে।
আমার পাশে বসা জাপানিজ ও ব্রাজিলিয়ান দুটি মেয়ে। ২১ বছরের ব্রাজিলিয়ান এই মেয়ে কখনোই তার দেশে যেতে চায় না। তার মা নাকি চায় কিন্তু তাতে তার কী আসে যায়।
সে ফিরে যেতে চায় না৷ ওখানে নাকি মানুষের টাকা ছিনতাই হয়। আমি অবাক তাকিয়ে রই, ওসব দেশেও এসব হয় নাকি! সেই সঙ্গে আমার ভেতরে বাস করা, বাংলাদেশের সংবাদপত্রে প্রতিনিয়ত চোখ রাখা এক পাঠক বলে ওঠে, ‘আর আমাদের হয় জীবন ছিনতাই! ’
আমি মিথ্যে বলি না কিন্তু সত্য গোপন করি।
দেশের বাইরে পড়াশোনা করা প্রতিটা শিক্ষার্থী তা করে।
আমিও স্বপ্নাবেশে রই-লেখক অভিজিতের ‘ঐ যে সুদূর নীহারিকা’র মতোই-অহর্নিশি। ’
আমি ফিরে যেতে চাই কি দেশে?
ডেভিড ফ্রিম্যানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলি, ‘আই ওয়ান্ট টু গো ব্যাক…’
ফিরে যাব? কিন্তু কোথায়? কোথায় ফিরি না বলে ২৪ ঘণ্টাকে এক একটা বছর গুনে রাখা…কোথায় ফিরব বলে ফেরা হয় না অজস্র দিন! কাদের কাছে বর্গা দেওয়া আমার দেশ?
আমার সামনে থাকা কলম হেসে বলে মধ্যযুগীয় তলোয়ারে তোমাদের মানুষ আজও শাণ দেয়।
পারবে তুমি? কেউ তোমার একটা পেনসিল মাঝ থেকে ভেঙে দিলে তার দুই ধারে পেনসিল সার্পনার বসিয়ে, আরও তীক্ষ্ণ পেনসিল বানাতে? একটি নয়, দুটি!
স্পিচ ক্লাসে পাওয়া সব কটা হাততালি আমাকে গোপনে ব্যঙ্গ করে যায়. . হাহ, এই তোমার দেশ?
আমার মেহেদী রাঙানো হাতের লাল রং কেবল-ই রক্ত মনে হয়…
আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি।

আপনার মন্তব্য জানান