ক্যানসাস প্রবাস জীবন হাইলাইটস

১০ দিনে ১৬ রাজ্যের ৫০ শহরে

amran1আমেরিকা মহাদেশে বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের (সামার) শুরুতে ঘোরার মজায় আলাদা। কোনো রাজ্যে (স্টেটে) ঠান্ডার প্রকোপ নেই। ছেলেমেয়েদের স্কুল বন্ধ। তাই এ সময় এখানে যে যার মতো করে ঘুরে বেড়ান। এরই ধারাবাহিকতায় আমরাও টানা দশ দিন ভ্রমণ করেছি। শেষ করতে ইচ্ছা করছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের মাঝামাঝি ক্যানসাস রাজ্যের উচিটা শহর থেকে রেন্ট–এ–কার (ভ্যান) নিয়ে আমরা ভ্রমণে বেরিয়েছিলাম ২ জুন বেলা ১১টায়। আর ফিরেছি ১২ জুন রাত ১১টায়। আমরা মোট নয় জন। আমরা যাই আমেরিকার পূর্ব দিকে। যেখানে কানাডা ও আমেরিকার সীমারেখা নির্ধারিত।
ক্যানসাস থেকে আই-৩৫ সড়ক ধরে গাড়ি চলছে তো চলছেই। রাস্তার দুপাশে শুধু সবুজের গড়াগড়ি। কোথাও চার লেন আবার কোথাও ছয় থেকে আট লেন সড়ক পথ। গাড়ির ভেতর শুধু চাকার শোঁ শাঁ আওয়াজ শোনা যায়। চলতি পথে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যাত্রাবিরতি নিতে বিশ-ত্রিশ মাইল পর এক্সিট নিতে হয়েছে। আবার কখনো গ্যাসের (পেট্রল) জন্য বিরতি।
লং ড্রাইভে গাড়ি চালাতে গেলে চালকের চোখ খোলা রাখতে পাশের সিটে বসে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হয়। অ্যারোস্পেসে পড়ুয়া চৌকস চালক বাঁধন যেন আকাশ পথে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। স্মুথ ড্রাইভিং! এ সময় গাড়িতে গ্যাসের দাম নিয়ে কথা হচ্ছিল। আলোচনায় যোগ দিলেন, কাবেরী বৌদি, রুপন দা, শুভেচ্ছা চক্রবতী, নঈম ও বাঁধন।
আলাপচারিতায় অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। জানা যায়, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে এখনো এক নম্বরে আমেরিকা। কারণ প্রতিদিন সারা আমেরিকা মহাদেশে প্রায় ২৫ কোটি (২৫০ মিলিয়ন) যানবাহন চলাচল করে থাকে। তাই এখানে গ্যাসের দাম সস্তা। বলা যায়, পানির চেয়েও কম দাম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের একেক রাজ্যে গ্যাসের দাম ভিন্ন। সবচেয়ে বেশি দাম ক্যালিফোর্নিয়ায়। প্রতি লিটার ৩.১২ ডলার। অন্যান্য রাজ্যে এক ডলার কম থাকে।

amran2কথার ফাঁকে ক্যানসাস-মিজৌরি, ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা হয়ে আই-৭০ হাইওয়ে ধরে একের পর এক ১৬টি রাজ্য পার করেছি। ইন্ডিয়ানায় এক মোটেলে রাত যাপন করলাম। ৪ জুন ভোরে আমেরিকার সবচেয়ে বড় সড়ক পথ আই-৭০ হাইওয়ে ধরে চলছি। পেনসিলভানিয়া থেকে শুরু হওয়া ২১৫১ মাইল দীর্ঘ এ হাইওয়ে নেভেরা গিয়ে শেষ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থলভাগের মাঝামাঝি বরাবর এ সড়ক পথ। যোগাযোগের জন্য এটি খুব জনপ্রিয় সড়ক। এরপরে রয়েছে আই ৯০ সড়ক। ৪ জুন রাতে নিউজার্সি পর্যটন শহর আটলান্টিক সিটিতে প্রবেশ করি। সেখানে দিপা দিদিমণির বাসায় উঠি। তাঁর আত্মীয়তা ভোলার নয়। আমেরিকার দ্বিতীয় ক্যাসিনো শহর বলে পরিচিত আটলান্টিক সিটি (প্রথম লাসভেগাস)। যেখানে রয়েছে আকাশছোঁয়া পাঁচ তারকা হোটেল আর ক্যাসিনোর আলোয় রাত জেগে থাকে আটলান্টিক শহর। আটলান্টিক সাগর পাড়ে রয়েছে বিশাল সেন্ডি বিচ। যেখানে প্রকৃতি-মানুষ-পশু-পাখি একসঙ্গে বসবাস করে। তাই সাগর সৈকতে হাত বাড়ালে মানুষের সঙ্গে গাঙ পাখি খেলা করে।
আমেরিকার একেক রাজ্যের বৈশিষ্ট্য একেক রকম। যেমন সবুজে ঘেরা বারমাউন্ট রাজ্য দেখতে ছবির মতো। রাতের কোনো এক সময় সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ওহাইও-ইন্ডিয়ানা রাজ্যের হাইওয়ের ধারে একাধিক মায়াবিনী হরিণের লাশ ভোরের আলোয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লম্বা জার্নিতে সড়কেই বেশির ভাগ সময় কাটে। তাই পাহাড়-নদী ও সবুজে বিছানো ধু-ধু প্রান্তর দেখতে দেখতে দিন ফুরায়।
amran3গাড়ির ভেতর হসপট অ্যাকটিভ থাকায় রবীন্দ্রসংগীতসহ অন্যান্য গান রাতভর চলে। গান শুনতে শুনতে চলে এলাম চেচেফিক বে ব্রিজ অ্যান্ড টানেল টোল স্টপে। দীর্ঘ পাঁচ মাইল লম্বা টানেল আটলান্টিক উত্তাল ঢেউ কাটিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা-পশ্চিম আমেরিকার যোগসূত্র হিসেবে কাজ করে। এ টানেল দিয়ে ১৫০টি ছোট-বড় নদীর পানি প্রবাহিত হয়ে থাকে। কিছু দূর ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়ি চলল। তারপর হঠাৎ গাড়ি টানেল হয়ে শাঁ করে বেরিয়ে গেল অপর প্রান্তে। টানেল থেকে বের হয়ে বিনোদনের জন্য রয়েছে সাগর থেকে মাছ ধরার মনোরম দৃশ্য। পেছনে ফেলে আসা সাগর মাঝে ব্রিজ-টানেল সাদা চোখে দেখা গেল।
অপর দিকে জল তরঙ্গের শহর নিউইয়র্কের বাফেলো সিটিতে ঢুকলে মনে হবে নায়াগ্রার জলোচ্ছ্বাসে হাবুডুবু খাচ্ছি। বাফেলো শহরে যেন প্রকৃতি নুইয়ে পড়েছে আপন মনে। হাডসন নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা সভ্যতার নবদিগন্ত নিউইয়র্ক সিটির টাইম স্কয়ার, এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং ও স্ট্যাচু অব লিবার্টি মাথা উঁচু করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন স্ট্যাচু অব লিবার্টি প্রতিদিন আমেরিকায় আসা পর্যটকদের স্বাগত জানায়। এ বিশাল মূর্তিটি ফ্রান্স বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে ২৮ অক্টোবর ১৮৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে উপহার দিয়েছিল।
amran4শিক্ষা নগরী কেমব্রিজ-ম্যাসাচুসেটসের পৃথিবীখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হার্ভার্ড, এমআইটি মাথা উঁচু করে সারা দুনিয়ায় শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে। এ হার্ভার্ড থেকে আমেরিকার সাতজন প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পৃথিবীখ্যাত শিক্ষার্থী পাসি উইলিয়াম ব্রিজম্যান (পদার্থ বিজ্ঞান), টি এস এলিয়ট (সাহিত্য), বারাক ওবামা শান্তিসহ নানা বিষয়ে ৪৭ জন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। এ ছাড়া ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ ও মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এখান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেছেন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ঢুকতে প্রতিষ্ঠাতা জন হার্ভার্ডের আপাদমস্তক একটি বিশাল ভাস্কর্য রয়েছে। প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা শিক্ষার্থীরা এ ভাস্কর্য বেদিতে হাত দিতে-দিতে তা খসে গেছে। বর্তমানে এর সংস্কারের কাজ চলছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রাচীনতম উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইভি লীগের আটটির মধ্যে ছয়টি ব্রাউন ইউনিভার্সিটি, কর্নেল, প্রিন্সটন, পেনসিলভানিয়া, ইয়েল ইউনিভার্সিটি, ডাটমাউথ কলেজ দেখা হলো। আইভি লীগের সবকটি প্রতিষ্ঠানই যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত। এগুলো কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার থেকে প্রতিবছরই গবেষণা ও অন্যান্য খাতে ব্যাপক অনুদান লাভ করে থাকে। বিশ্বের সবচেয়ে অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে পা দিলে বোঝা যায় শিক্ষার গৌরবগাথা। ক্যাম্পাসের প্রতিটি দালানকোঠায় নানা বর্ণের অঙ্কন চিত্র প্রকাশ করে ঐতিহ্যের ধারণা। বোস্টনে ঢোকার আগে মুঠোফোনে যোগাযোগ করায় চট্টগ্রামের এক সময়ের নামকরা ফটোসাংবাদিক বর্তমানে ব্যাংকার তাপস বড়ুয়া আমাদের পুরো বোস্টন ঘুরিয়ে দেখালেন।
amran5পোটো ম্যাক নদীর তীরে আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি। এতে রয়েছে আধুনিক সভ্যতার সোপান ওয়াশিংটন মনুমেন্ট। যার উচ্চতা ৫৫৫ ফিট। ১৮৮৪ সালে স্থাপিত ও পাথর দিয়ে তৈরি এ মনুমেন্ট ওয়াশিংটন ডিসির সবচেয়ে বড় স্থাপনা। আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্টের নামকরণে ওয়াশিংটন মনুমেন্ট তৈরি করা হয়। এ স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ শহরে (ডিসি) এর চেয়ে বড় (উচ্চতায়) আর কোনো দালানকোঠা তৈরি হবে না। এ ছাড়া রয়েছে চোখ ধাঁধানো শ্বেত পাথরের হোয়াইট হাউস, ক্যাপিটাল বিল্ডিং ও সুপ্রিম কোট। ওয়াশিংটন, লিংকন মেমোরিয়াল, টমাস জেফারসন, রুজভেল্ট ও জন এফ কেনেডি মেমোরিয়াল। ন্যাশনাল ইয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম। এতে প্রথম মহাকাশযান, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস এবং সমরাস্ত্রসহ নানা বিষয়ের দালিলিক প্রমাণসহ সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি পৃথিবীর প্রথম নভোচারী কুকুর লাইকার ডামিও রয়েছে। রাশিয়ার স্পুটনিক-২ মহাকাশ যানে চড়ে মহাশূন্যে ভ্রমণে বেরিয়েছিল লাইকা। সত্যিকার অর্থে সেই প্রথম পৃথিবীর কোনো প্রাণী মহাশূন্যে পাড়ি জমিয়েছিল। অত্যধিক চাপ ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাইকা মারা গিয়েছিল। জানা যায়, প্রতিদিন বিশ হাজার দর্শনার্থী এ মিউজিয়াম পরিদর্শন করেন।
amran6টাইম ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারে আমাদের ভ্রমণ উদ্যোক্তা সবার প্রিয় মুখ প্রকৌশলী রুপন কান্তি দেব বেশ যত্নবান ছিলেন। তার নির্দেশনায় ১৬টি রাজ্যের ৫০টি শহর সঠিক সময়ে আমাদের ঘোরা সম্ভব হয়েছে।

49 মন্তব্য

আপনার মন্তব্য জানান